• স্টাইল ক্রেইজ (style craze) ফ্যাশন হাউজে নতুন ঈদ কালেকশন
  • ২০২০ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি পাচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক
  • বিশেষ তহবিলে বিনিয়োগের সীমা বেঁধে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
  • ব্যাংকিং সেক্টরেও আছে দুষ্টু চক্র : এনবিআর চেয়ারম্যান
  • ৫ দিনব্যাপী ব্যাংকিং মেলা শুরু
  • এসএমই ঋণে সুদ হারের ব্যবধান সিঙ্গেলে রাখার নির্দেশ
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি:
  • বাংলা একাডেমিতে বসছে ব্যাংকিং মেলা
  • দুদক বেসিক ব্যাংকের নথিপত্র সংগ্রহে আদালতে যাবে
  • স্কুল ব্যাংকিংয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ

চেক-ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির নেপথ্যে!

cf

ব্যাংক নিউজ ২৪ ডট কমঃ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকিং ইন্সট্রুমেন্ট তথা চেক, ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ডের সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা ও নির্দেশনা থাকলেও তা সঠিকভাবে মানছে না অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক। ফলে আর্থিক খাতে বিগত কয়েক বছরে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং দুর্নীতি বেড়েই চলেছে। আর এসব জালিয়াতির নেপথ্যে স্বয়ং প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর গ্রাহকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর অনুসন্ধান ও তদন্তে এসব দিক উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা ব্যাংক নিউজ ২৪ ডট কমকে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গ্রাহক সেবা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু অভ্যন্তরীণ নীতিমালা ও নিয়ম-কানুন রয়েছে। যা অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকই সঠিকভাবে পালন করছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে জাল-জালিয়াতির মতো ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জব ডেসক্রিপশন (ব্যাংক কর্মকর্তাদের কার কী কাজ) ও এলোকেশন (ব্যাংক কর্মকর্তাদের কে কোথায় কাজ করবেন) থাকার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। তবে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মকর্মচারীদের এই জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশন নেই। ফলে জাল-জালয়াতির ঘটনার সাথে যদি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িয়ে পড়েন, তা বের করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এম মাহফুজুর রহমান ব্যাংক নিউজ ২৪ ডটকম-কে বলেন, ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাত্রই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশন থাকা উচিত। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দেশের প্রত্যেকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যা রাখার বিধানও রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর প্রতি সবসময়ই নজরদারী করে থাকি। যাতে করে জালিয়াতি বা প্রতারণার ঘটনা না ঘটে।

তিনি বলেন, যদি ব্যাংক বা এর কর্মকর্তা এই নির্দেশনা না মেনে চলে এবং আমাদের ইন্সপেকশনে এই ধরণের ঘটনা প্রকাশ পায় তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে ব্র্যাক ব্যাংক গুলশান শাখার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রাহক ‘উর্মি ফাশন গ্যালারী’র পক্ষে ৪টি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে এসিআই সল্ট লি. এর এ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই জালিয়াতির বিষয়টি উঠে আসে। যা পরবর্তীতে দুদকে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তারা জালিয়াতির মাধ্যমে এসিআই সল্টের এ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নিয়ে উর্মি ফ্যাশন গ্যালারীর একাউন্টে জমা দেখিয়েছে। পরে ওই ৪টি নকল চেক সৃজন করেন এবং ব্র্যাক ব্যাংকে ডিজিটাল (ইউবিএ) মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষায় সঠিক ঘোষণা দিয়ে টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দেন।
এছাড়া জালিয়াতির আরেকটি ঘটনা ঘটে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মোহাম্মদপুর শাখায়। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় করা মামলার বিবরণে দেখা যায়, ব্যাংকটির পাঁচজন গ্রাহকের হিসাব থেকে ডেবিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬ লাখ সাত হাজার টাকা আত্মসাত করা হয়। এ মামলায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা মো. সুমন খানকে আসামি করা হয়। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মো. সুমন খান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে কাজ করার অনীহা প্রকাশ করলে তাকে ফ্রন্ট ডেস্কে ও জেনারেল ব্যাংকিং এবং নতুন গ্রাহক আনার দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে কাজের সূত্রে তিনি বিভিন্ন গ্রাহকের সাথে ব্যাক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে ডেবিট কার্ড নিতে উৎসাহ প্রদান করেন। এরপর ওইসব গ্রাহকদের মধ্যে ৫ জন গ্রাহক অভিযোগ করেন, তারা ডেবিট কার্ড পাননি কিন্তু তাদের ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে একাউন্ট থেকে প্রায় ১৬ লাখ সাত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এই ঘটনার সাথে সুমনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় ব্যাংকটি। এই ঘটনায় সুমনের চাকরির মোহাম্মদপুর শাখায় কর্মকালীন জব ডেসক্রিপশন, রেসপনসিবিলিটি ও এলোকেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্রের মূল কপি সরবরাহ করতে বলে দুদক। একইসঙ্গে ব্যাংকের পাঁচজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের ডেবিট কার্ড সংক্রান্ত ওই শাখার ফরোয়ার্ডিং লেটার, ডেবিট কার্ড ও পিন কোড সরবরাহের প্রমাণ, কার্ড ও পিনগুলোর সংরক্ষণ ও ডেলেভারি প্রদানকারী কর্মকর্তার পরিচয়ও দিতে বলা হয়। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে হস্তান্তর করতে পারেনি বলে জানিয়েছে দুদক সূত্র।

চলতি বছরের ৪ আগস্ট রাজধানীর শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের করা এক মামলা থেকে জানা যায়, কোয়ালিটি টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ লি. নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. কামরুজ্জামান এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের (ডাচ বাংলা ও সাউথইস্ট ব্যাংক) যোগসাজসে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া দলিল ও কোম্পানির ভুয়া প্যাড বানিয়ে দুটি ভুয়া একাউন্টের মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়। ডাচ বাংলা ব্যাংকের শিল্পাঞ্চল শাখায় ও সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রগতি স্মরণি শাখায় এই আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাউথইষ্ট ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপকসহ দুইজনকে বহিস্কার করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

সূত্রমতে, ব্যাংকিং ইন্সট্রুমেন্ট (যেমন- চেক, ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ড ) সঠিকভাবে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বেসরকারি ব্যাংকগুলো সঠিকপন্থা অবলম্বন করছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের চেক জালিয়াতি এবং চেকের পাতা চুরি যাওয়ার মতো ঘটনাও বেড়ে চলেছে

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুসারে গ্রাহকের কেওয়াইসি (নো ইউর কাস্টমার) নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যাংক ও কর্মকর্তাদের। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই সব হিসাবের কেওয়াইসি সংরক্ষণ করে না।  বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংক থেকে ইস্যু করা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সঠিক গ্রাহকের কাছে না পৌঁছে প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রাহক জানেনই না তার ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড কেউ ব্যবহার করে তার একাউন্টে থাকা অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।এছাড়া চুরি যাওয়া চেকের পাতা ব্যবহার করে প্রতারণামূলকভাবে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে অর্থ লোপাট হচ্ছে। যার সাথে মূলত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে বিগত বেশ কয়েক বছরে। এসব ঘটনা অনুসন্ধান ও তদন্তে নেমে দুদক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মকর্মচারীদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের সাথে অনিয়ম, প্রতারণা এবং জাল-জালিয়াতির প্রমাণও পেয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই কর্মকর্তা-কর্মকর্মচারীদের জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশন রাখছে না।
দুদকের এ ধরণের ঘটনার অনুসন্ধান-তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের লোপাট হওয়া অর্থের পেছনে জড়িত স্বয়ং ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী। সম্প্রতি এ ধরণের দু’টি ঘটনায় অনুসন্ধানে নেমে দুদক দেখতে পায় আরব বাংলাদেশ ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মকর্মচারীদের জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশন নেই। এতে করে এ দু’টি ব্যাংকের দু’জন গ্রাহকের একাউন্ট থেকে লোপাট হওয়া অর্থের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, গ্রাহক যে তার চেক বইটি বুঝে পেয়েছেন এমন একটি রিসিপ্ট কপিতে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তারই সই নেই। ফলে চেক জালিয়াতির ঘটনায় কোন কর্মকর্তা জড়িত ছিল, তা খুঁজে পেতে দুস্কর হয়ে পড়ে দুদকের। এ ধরণের চেক জালিয়াতির ঘটনায় বিগত বেশ কয়েক বছর আগে এইচএসবিসি ব্যাংকের ঘটলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে অধিকাংশ ব্যাংকই জব ডেসক্রিপশন ও এলোকেশন চালু না করার বিষয়ে দুদককে জানিয়েছে, এই পন্থাটি অনেক ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। তবে এসব অজুহাত মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দুদক। তাদের মতে, বেসরকারি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি কর্মকর্তা-কর্মকর্মীদের ব্যাপারে নিয়ম-নীতি সঠিকভাবে পালন করতেন তবে এসব ঘটনা কখনই বেশি দূর গড়াতে পারতো না।

দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বেসরকারি একটি ব্যাংকে ২০১৩ সালে চেকের মাধ্যমে গ্রাহক টাকা তুলে নেয়ার পর ওই ব্যাংক কর্মকর্তা তা ঘষামাজা করে টাকার অংক পরিবর্তন করে তা আবার ব্যাংকে জমা দিয়ে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে ২৪ লাখ অর্থ তুলে নেন। কিন্তু এটা যে জাল চেক তা মেশিনে ধরা পড়েনি।

এ ঘটনা সম্পর্কে দুদকের নাম প্রকাশে একজন কর্মকর্তা বলেন, এক্ষেত্রে ব্যাংক ম্যানেজারের দায়িত্ব হচ্ছে গ্রাহককে টেলিফোন করে মোটা অংকের চেক ভাঙ্গানোর বিষয়টি যাচাই করে নেয়া। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংকেরই ম্যানেজাররা তা পালন করেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মূল্যবান অর্থ লোপাট যাচ্ছে।

এসব ঘটনায় মামলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং নীতিমালা ও নিয়মনীতি মেনে না চলায় প্রতারকেরা জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের অর্থ লোপাট করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ম্যানেজার বা কর্মকর্তারা যদি কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাউন্ট খোলার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র যথাযথভাবে যাচাই করতেন, তবে প্রতারকদের জাল-জালিয়াতির বিষয়গুলো ধরা পড়তো।

বিভাগ - : ব্যাংক

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য দিন